×

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ: (১৭৬৩–১৮০০) Sannyasi-Fakir Rebellion.

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ: (১৭৬৩–১৮০০) Sannyasi-Fakir Rebellion.

ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নেই বাংলার মানুষ যে কোম্পানির শোষণনীতি মেনে নিতে রাজি ছিল না, তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হলো সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ। প্রায় ৪০ বছর ধরে (১৭৬৩–১৮০০) চলে এই আন্দোলন, যেখানে সামিল হয় প্রায় 50,000 এরও বেশি সাধারণ মানুষ—সন্ন্যাসী, ফকির, কৃষক, বেকার সৈনিক ও ক্ষমতাচ্যুত জমিদার। বাংলায় কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে এটিই ছিল সর্বপ্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ আন্দোলন

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘আনন্দমঠ’ এই বিদ্রোহকে অবলম্বন করেই রচিত, যা এই আন্দোলনের বীরত্ব, ত্যাগ ও অনুভূতিকে সাহিত্যরূপে অমর করে রেখেছে।

সন্ন্যাসী ও ফকিরদের ভূমিকা:

বাংলা-বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলমান ফকির তীর্থযাত্রা, ধর্মপ্রচার ও রেশম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মিলেমিশে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছিলেন। অনেকে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে স্থায়ীভাবেও বসতি গড়ে তুলেছিলেন।

কিন্তু ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর তাদের ওপর অযৌক্তিক কর, তীর্থকর, যাতায়াত বাধা, এবং ব্যবসায়িক শোষণ চাপাতে শুরু করে। তাদের উপর অমানবিক আচরণ এবং দরিদ্র কৃষকদের উপর অত্যাচার দেখে সন্ন্যাসী ও ফকিররা বিদ্রোহের নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন।

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের প্রধান কারণ:

ইংরেজদের শোষণ ও অত্যাচার:

ইংরেজ কুঠিপতিরা বাংলায় ব্যাপক লুণ্ঠনে মেতে ওঠে। তারা কৃষকদের উপর বাড়তি খাজনা চাপায় এবং সামান্য কারণে কৃষকদের জমি বাজেয়াপ্ত করত। সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায় যারা কৃষিকাজেও জড়িত ছিল, তারাও এই শোষণের শিকার হয়।

তীর্থকর আরোপ:

হিন্দু সন্ন্যাসীরা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন তীর্থে যেতেন। কোম্পানি সেসব পথের উপর তীর্থকর বসিয়ে জোরপূর্বক অর্থ আদায় শুরু করে। এটি সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর আঘাত ছিল।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০):

মন্বন্তরের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। খাদ্যাভাবের সুযোগে কোম্পানির কর্মচারীরা চরম হারে শোষণ, লুণ্ঠন ও অত্যাচার চালায়। এই সময় মানুষের মনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে।

অত্যধিক রাজস্ব ও কৃষক উচ্ছেদ:

ইংরেজ কোম্পানির রাজস্বনীতি ছিল নির্মম। বাড়তি রাজস্ব আদায়ের জন্য কৃষকদের অবলীলায় উচ্ছেদ করা হত। জমিদাররাও ইংরেজদের চাপে কৃষকদের উপর দমনপীড়ন বাড়িয়ে দেয়।

রেশম ব্যবসায় কোম্পানির হস্তক্ষেপ:

ফকির ও সন্ন্যাসীদের অনেকেই রেশম বাণিজ্য করতেন। কোম্পানি এ ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, ফলে তাদের ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়।

এই সব কারণ থেকেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, যা পরে বাংলার গ্রামাঞ্চলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

বিদ্রোহের বিস্তার:

প্রথম কেন্দ্র – ঢাকা:

১৭৬৩ সালে ঢাকাতেই প্রথম সংঘর্ষের সূচনা। এখান থেকেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে–

  • মালদহ
  • রংপুর
  • দিনাজপুর
  • বোয়ালিয়া
  • ময়মনসিংহ
  • কোচবিহার
  • ফরিদপুর

সন্ন্যাসী ও ফকিররা কোম্পানির কুঠি, মহাজনদের ঘর, ও অত্যাচারী জমিদারদের আক্রমণ করতে থাকে। সর্বত্রই কৃষকদের প্রবল সমর্থন তারা পেয়েছিল।

বিদ্রোহের প্রধান নেতৃবৃন্দ:

এই আন্দোলন ছিল নানান গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রতিরোধ। উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দ:

  • মজনু শাহ
  • মুশা শাহ
  • চিরাগ আলি শাহ
  • পরাগল শাহ
  • ভবানী পাঠক
  • দেবী চৌধুরাণী (পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমদিকের নারী গেরিলা নেতা)

১৭৮৭ সালে ভবানী পাঠক ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে নিহত হন। মজনু শাহ ছিলেন সবচেয়ে দৃঢ় ও জনপ্রিয় নেতা—তার নেতৃত্বেই উত্তরবঙ্গ জুড়ে বিদ্রোহ সবচেয়ে প্রবল আকার ধারণ করে।

সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নাকি কৃষক বিদ্রোহ?

যদিও একে ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ বলা হয়, ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম হান্টার একে “কৃষক বিদ্রোহ” হিসেবেই উল্লেখ করেন। কারণ:

  • আন্দোলনে কৃষকদের প্রধান অংশগ্রহণ ছিল,
  • বিদ্রোহের কারণ ছিল কৃষকপীড়ন,
  • শোষিত জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম এটির মূল উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে ওয়ারেন হেস্টিংস বিদ্রোহীদের “হিন্দুস্থানের যাযাবর” ও “ডাকাত” বলে অপমানজনক উপাধি দেন—যা ব্রিটিশদের স্বার্থরক্ষা ও সত্য গোপনেরই প্রয়াস।

বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ:

সাংগঠনিক দুর্বলতা:

বিদ্রোহীদের কোনও সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। প্রতিটি এলাকায় আলাদা আলাদা দল পরিচালিত হত, ফলে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়।

অস্ত্রশস্ত্রের অভাব:

সন্ন্যাসী ও ফকিরদের কাছে ছিল সাধারণ দেশি অস্ত্র। ইংরেজদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের মোকাবিলা করা তাই কঠিন ছিল।

অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব:

অনেক নেতা সাহসী হলেও সামরিক কৌশলে তারা ইংরেজদের তুলনায় দুর্বল ছিলেন।

অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য না থাকা:

বিদ্রোহ ছিল শোষণের প্রতিবাদ ও প্রতিশোধমূলক আন্দোলন, কিন্তু সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য বা স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ধারণা তখনও গড়ে ওঠেনি।

ফলে চার দশকের দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৮০০ সালের মধ্যে বিদ্রোহ প্রায় সম্পূর্ণ দমিত হয়।

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের গুরুত্ব:

  • বাংলায় কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ
  • হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অন্যতম ঐতিহাসিক উদাহরণ
  • কৃষকশ্রেণির দুর্দমনীয় সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ
  • পরবর্তী নীল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহসহ অন্যান্য সংগ্রামের অনুপ্রেরণা
  • ভারতের জাতীয় আন্দোলনের পূর্বসূরি

উপসংহার:

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ বাংলায় কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহৎ ও সংগঠিত গণপ্রতিরোধের নিদর্শন। অত্যাচার, শোষণ ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে কৃষক, সন্ন্যাসী, ফকির, বেকার সৈনিক—সমস্ত শোষিত জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম এই বিদ্রোহকে ঐতিহাসিক তাৎপর্য দিয়েছে। যদিও সংগঠনের অভাব, অস্ত্রস্বল্পতা ও কৌশলগত দুর্বলতার কারণে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দমিত হয়, তবুও এটি বাংলার মানুষকে প্রতিরোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। পরবর্তী নীলবিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহসহ বহু গণআন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ভারতের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

GSschool.in হল স্কুলভিত্তিক পড়াশোনার জন্য একটি সহায়ক ওয়েবসাইট। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে এম.এ করেছি এবং শিক্ষকতায় যুক্ত আছি। এখানে স্কুল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নোটস, প্রশ্নপত্র, এবং পড়াশোনার টিপস দেওয়া হয়।

Post Comment

error: Content is protected !!