১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন: প্রেক্ষাপট, বৈশিষ্ট্য, ত্রুটি ও সামগ্রিক মূল্যায়ন: Government of India Act 1935.
ভূমিকা:
১৯৩০-এর দশকে ভারতের জাতীয় আন্দোলন নতুন গতি পায়। ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ, বিপ্লবী কার্যকলাপ, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং অসহযোগ–নাগরিক অবাধ্যতা আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করে, যা ইতিহাসে Government of India Act, 1935 নামে পরিচিত।
এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে সবচেয়ে বিস্তৃত ও বৃহত্তম সাংবিধানিক সংস্কার আইন, যা ১৯৩৭ সালে কার্যকর হয়।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের প্রেক্ষাপট:
মন্টেগু–চেমসফোরড সংস্কারের ব্যর্থতা:
১৯১৯ সালের মন্টেগু–চেমসফোরড আইন ভারতীয়দের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।
দৈত শাসন ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ায়, গান্ধীজীর নেতৃত্বে জাতীয় আন্দোলন গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়। ফলে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে।
বিপ্লবী আন্দোলনের বৃদ্ধি:
১৯২০–৩০ এর দশকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপ্লবী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়।
হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স, যুগান্তরের মতো বিপ্লবী দলগুলি ব্রিটিশ প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে। সরকারের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং তারা নতুন আইন প্রয়োজনীয় বলে মনে করে।
জাতীয়তাবাদের প্রভাব বৃদ্ধি:
স্বদেশী আন্দোলন, অসহযোগ, সাইমন বয়কট, লবণ সত্যাগ্রহ—এসব আন্দোলনের ফলে ভারতের সাধারণ জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে।
ভারতের জাতীয়তাবাদী উত্থান দমন করতে এবং ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘নিরাপত্তা বলয়’-এ রাখতে সরকার নতুন সাংবিধানিক পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়া:
১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন ভারতে আসে ভারতীয়দের কোন সদস্য ছাড়াই।
এর ফলে সারা ভারতে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়। “Simon Go Back” স্লোগানে দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে।
তিনটি গোলটেবিল বৈঠক ও ১৯৩৩ সালের শ্বেতপত্র:
গোলটেবিল বৈঠকগুলোতে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মতামত নিয়ে ১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ সরকার একটি White Paper প্রকাশ করে।
এর ভিত্তিতেই ১৯৩৪ সালে বিল পাস হয় এবং ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন কার্যকর হয়।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের বৈশিষ্ট্য:
১৯৩৫ সালের আইনে দুটি প্রধান কাঠামো ছিল—
- কেন্দ্রীয় সরকার (Federal Government)
- প্রাদেশিক সরকার (Provincial Government)
যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব:
এই আইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল—
ব্রিটিশ ভারত + দেশীয় রাজ্য = Indian Federation / যুক্তরাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা।
তবে দেশীয় রাজ্যগুলির যোগদান ছিল স্বেচ্ছাধীন, বাধ্যতামূলক নয়।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠন:
কেন্দ্রে ৫ বছর মেয়াদি দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের কথা বলা হয়—
ফেডারেল অ্যাসেম্বলি (নিম্নকক্ষ):
- মোট সদস্য: ৩৭৫ জন
- ব্রিটিশ ভারত: ২৫০
- দেশীয় রাজ্য: ১২৫ (মনোনীত)
কাউন্সিল অব স্টেট (উচ্চকক্ষ):
- মোট সদস্য: ২৬০ জন
- ব্রিটিশ ভারত: ১৫৬
- দেশীয় রাজ্য: ১০৪ (মনোনীত)
কেন্দ্র–প্রদেশের ক্ষমতা বণ্টনের তিনটি তালিকা:
আইনে মোট ৩টি legislative list তৈরি করা হয়—
কেন্দ্রীয় তালিকা:
- প্রতিরক্ষা
- বৈদেশিক নীতি
- মুদ্রা
- রেলওয়ে
- ডাকব্যবস্থা
প্রাদেশিক তালিকা:
- শান্তি ও শৃঙ্খলা
- পুলিশ
- শিক্ষা
- স্থানীয় প্রশাসন
- স্বাস্থ্য
যুগ্ম তালিকা:
- সংবাদপত্র
- দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন
- বিবাহ ও উত্তরাধিকার
- বাণিজ্য ও শিল্প
সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত বিভাগ (দৈত শাসন):
কেন্দ্রে আবার নতুন করে দৈত শাসন প্রবর্তিত হয়—
সংরক্ষিত বিভাগ:
যা ভাইসরয় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন—
- প্রতিরক্ষা
- বৈদেশিক নীতি
- সৈন্য
- মুদ্রা
- আইন–শৃঙ্খলা
- ধর্মসংক্রান্ত দপ্তর
হস্তান্তরিত বিভাগ:
মন্ত্রিসভার পরামর্শক্রমে পরিচালিত—
- শিক্ষা
- স্বাস্থ্য
- পরিবহণ
- কৃষি
পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা বজায় রাখা:
মুসলিম, শিখ, ইউরোপীয়, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, ডালিত, ব্যবসায়ী শ্রেণি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের জন্য সাম্প্রদায়িক নির্বাচন (Separate Electorate) চালু রাখা হয়।
এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে।
মন্ত্রীসভা গঠনের ব্যবস্থা:
ভাইসরয়ের অধীনস্থ একটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা রাখার কথা বলা হয়।
তবে মন্ত্রীদের কার্যক্রমের উপরে ভাইসরয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় ছিল।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ত্রুটি:
ভাইসরয় ও গভর্নরের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা:
- আইন অনুমোদন
- বাজেট নিয়ন্ত্রণ
- জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ
- সংরক্ষিত বিভাগের পূর্ণ কন্ট্রোল
এ কারণে ভারতীয়রা প্রকৃত ক্ষমতা পায়নি।
ভোটাধিকার সীমিত রাখা:
মাত্র ১৯% ভারতীয় ভোটাধিকার পায়।
অধিকাংশ কৃষক, শ্রমিক, নারী ও দরিদ্র মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
দেশীয় রাজ্যগুলির যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান ঐচ্ছিক:
ফলে অনেক দেশীয় রাজ্য ফেডারেশনে যোগ দেয়নি।
ফেডারেশন বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
সাম্প্রদায়িক নির্বাচন ব্যবস্থা বজায় রাখা:
এটি ছিল জাতীয় ঐক্যের পথে প্রধান বাধা।
হিন্দু-মুসলিম বিভাজন আরও গভীর হয়।
পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন না দেওয়া:
ভারতবাসীকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয়নি।
ব্রিটিশ স্বার্থই আইনের মূল ভিত্তি ছিল।
ভারত শাসন আইন ১৯৩৫-এর মূল্যায়ন:
যদিও এই আইন ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু উন্নতি আনে—
- প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন
- নির্বাচিত মন্ত্রিসভা
- প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তারিত নির্ধারণ
তবুও এটিকে “ভারতীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রথম ধাপ” বলা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি ব্রিটিশ আধিপত্য বজায় রাখারই কৌশল ছিল।
উপসংহার:
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি একদিকে ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোকে সুসংগঠিত করলেও অন্যদিকে ভারতীয়দের প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়নি। তাই কংগ্রেসসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এই আইনে সন্তুষ্ট হয়নি।
পরে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সংবিধান প্রণয়নে এই আইন আংশিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সর্বোপরি, ১৯৩৫ সালের আইন ছিল ব্রিটিশ সরকারের চাপসৃষ্ট অবস্থায় গ্রহণ করা একটি অসম্পূর্ণ সাংবিধানিক সমাধান, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথে ভারতীয়দের আরও ঐক্যবদ্ধ করেছিল।



Post Comment