×

ভারতের গণপরিষদের গঠন: The Constituent Assembly of India.

ভারতের গণপরিষদের গঠন: The Constituent Assembly of India.

Table of Contents

ভূমিকা:

ভারতের সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে যে সর্বোচ্চ প্রতিনিধি সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল, তা হল ভারতের গণপরিষদ। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রাক্কালে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য একটি লিখিত সংবিধান রচনার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভূত হয়। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্যই ভারতের গণপরিষদ গঠিত হয়। গণপরিষদ শুধুমাত্র একটি আইনসভা নয়, বরং এটি ছিল ভারতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর রূপকার।

গণপরিষদ গঠনের পটভূমি:

ভারতের গণপরিষদ গঠনের পেছনে দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের অবদান রয়েছে। কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বহুদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিল যে ভারতের সংবিধান রচনার দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতেই থাকা উচিত। অবশেষে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রেরিত ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতের গণপরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই পরিকল্পনার মাধ্যমেই প্রথমবার ভারতীয়দের হাতে সংবিধান রচনার ক্ষমতা অর্পিত হয়, যা ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

গণপরিষদের সদস্য সংখ্যা ও বিন্যাস:

প্রথমদিকে ভারতের গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৮৯ জন। এই সদস্যদের মধ্যে—

  • ২৯৬ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে।
  • ৯৩ জন প্রতিনিধি মনোনীত হন দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলির সদস্যরা গণপরিষদ থেকে বাদ পড়েন। এর ফলে ভারতের গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৯৯ জন। এই সদস্যরাই শেষ পর্যন্ত ভারতের সংবিধান প্রণয়নের কাজে অংশগ্রহণ করেন।

গণপরিষদের সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি:

গণপরিষদের সদস্যরা পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। প্রত্যক্ষভাবে জনগণের ভোটে গণপরিষদ গঠিত হয়নি।

  • প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত সদস্যরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুসারে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচন করেন
  • প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার জন্য একজন প্রতিনিধি নির্বাচনের নিয়ম ছিল
  • ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়

এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

দেশীয় রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব:

দেশীয় রাজ্যগুলির প্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হননি। এই রাজ্যগুলির শাসকগোষ্ঠী বা প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধিরা গণপরিষদে মনোনীত হন। যদিও এই পদ্ধতি পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিল না, তবুও দেশীয় রাজ্যগুলির অংশগ্রহণ ভারতের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রগঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব:

ভারতের গণপরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন বহু বিশিষ্ট নেতা ও চিন্তাবিদ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • অস্থায়ী সভাপতি: ড. সচ্চিদানন্দ সিনহা
  • স্থায়ী সভাপতি: ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
  • খসড়া সংবিধান কমিটির সভাপতি: ড. বি. আর. আম্বেদকর

ড. বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে খসড়া সংবিধান কমিটি সংবিধানের মূল কাঠামো রচনা করে, যার ফলে তাঁকে ভারতের সংবিধানের জনক বলা হয়।

গণপরিষদের গুরুত্ব:

গণপরিষদ শুধুমাত্র সংবিধান প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি আইনসভা হিসেবেও কাজ করেছে এবং স্বাধীনতার পরবর্তী প্রাথমিক বছরগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গণপরিষদের আলোচনায় গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়ের বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

উপসংহার:

ভারতের গণপরিষদ ছিল একটি ব্যাপক প্রতিনিধিত্বমূলক ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চল, ধর্ম, ভাষা ও মতাদর্শের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। যদিও এটি প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়নি, তবুও এর কাজ ছিল গভীরভাবে গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমূলক। এই গণপরিষদের গঠন ও কার্যপ্রণালীই ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তি রচনা করে।

MCQ: ভারতের গণপরিষদের গঠন:

১। ভারতের গণপরিষদ গঠিত হয় কোন পরিকল্পনার ভিত্তিতে?

ক) ক্রিপস মিশন
খ) ওয়াভেল পরিকল্পনা
গ) ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা
ঘ) মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা

২। ভারতের গণপরিষদ গঠিত হয় কোন সালে?

ক) ১৯৪২ খ্রি.
খ) ১৯৪৫ খ্রি.
গ) ১৯৪৬ খ্রি.
ঘ) ১৯৪৭ খ্রি.

৩। প্রথমদিকে ভারতের গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা কত ছিল?

ক) ২৯৯ জন
খ) ৩৮৯ জন
গ) ৪০০ জন
ঘ) ৩৫০ জন

৪। ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশগুলি থেকে কতজন প্রতিনিধি গণপরিষদে ছিলেন?

ক) ২৯৯ জন
খ) ৯৩ জন
গ) ২৯৬ জন
ঘ) ২৫০ জন

৫। দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে গণপরিষদে কতজন প্রতিনিধি ছিলেন?

ক) ৭৫ জন
খ) ৯০ জন
গ) ৯৩ জন
ঘ) ১০০ জন

৬। দেশভাগের পর ভারতের গণপরিষদের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায়—

ক) ৩৮৯ জন
খ) ৩৫০ জন
গ) ৩২০ জন
ঘ) ২৯৯ জন

৭। গণপরিষদের সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন?

ক) প্রত্যক্ষ ভোটে
খ) রাষ্ট্রপতির দ্বারা
গ) পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে
ঘ) গভর্নরের দ্বারা

৮। গণপরিষদের সদস্য নির্বাচনে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল?

ক) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতি
খ) একক ভোট পদ্ধতি
গ) আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি
ঘ) সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতি

৯। প্রতি কত জনসংখ্যার জন্য একজন গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হতেন?

ক) ৫ লক্ষ
খ) ৮ লক্ষ
গ) ১০ লক্ষ
ঘ) ১২ লক্ষ

১০। গণপরিষদের অস্থায়ী সভাপতি কে ছিলেন?

ক) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
খ) জওহরলাল নেহরু
গ) ড. সচ্চিদানন্দ সিনহা
ঘ) ড. বি. আর. আম্বেদকর

১১। ভারতের গণপরিষদের স্থায়ী সভাপতি কে ছিলেন?

ক) ড. সচ্চিদানন্দ সিনহা
খ) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) সর্দার প্যাটেল

১২। খসড়া সংবিধান কমিটির সভাপতি কে ছিলেন?

ক) জওহরলাল নেহরু
খ) রাজেন্দ্র প্রসাদ
গ) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
ঘ) ড. বি. আর. আম্বেদকর

১৩। দেশীয় রাজ্যগুলির প্রতিনিধিরা কীভাবে গণপরিষদে আসতেন?

ক) জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে
খ) ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা
গ) রাজ্যের শাসকদের দ্বারা মনোনীত হয়ে
ঘ) কংগ্রেসের মাধ্যমে

১৪। গণপরিষদ মূলত কোন কাজের জন্য গঠিত হয়েছিল?

ক) আইন প্রণয়ন
খ) শাসন পরিচালনা
গ) সংবিধান রচনা
ঘ) বিচারকার্য পরিচালনা

১৫। ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়—

ক) ১৫ আগস্ট ১৯৪৭
খ) ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৯
গ) ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০
ঘ) ২৯ নভেম্বর ১৯৪৯

GSschool.in হল স্কুলভিত্তিক পড়াশোনার জন্য একটি সহায়ক ওয়েবসাইট। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে এম.এ করেছি এবং শিক্ষকতায় যুক্ত আছি। এখানে স্কুল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নোটস, প্রশ্নপত্র, এবং পড়াশোনার টিপস দেওয়া হয়।

Post Comment

error: Content is protected !!